দেশের শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক দরপতন চলাকালীন স্থিতিশীলতা ফেরাতে ‘স্টক মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ নামে একটি তহবিল গঠনের ঘোষণা দেয় ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি)। এরপর অর্ধ বছর পার হলেও তহবিল গঠনে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ ঘোষণা দিয়ে ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে বেশকিছু সুবিধা ভোগ করে। ফলে অভিযোগ উঠেছে অনৈতিকভাবে সুবিধা নেয়ার জন্যই তহবিল গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, গত বছরের ২৩ অক্টোবর নিজেদের মধ্যে একটি বৈঠক করে বিএবির চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার স্টক মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেন।
নজরুল ইসলাম মজুমদারে ভাষ্য অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে এ ফান্ডের আকার হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার কোটি টাকা। যাতে ২৯টি ব্যাংক সর্বনিম্ন ২০ কোটি টাকা করে দেয়ার কথা। অভিযোগ উঠেছে ফান্ড গঠন নয়, মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায়ের জন্য ওই ঘোষণা দেয়া হয়।
এরই অংশ হিসেবে বিএবির ঘোষণার আগের সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আরেক সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বাংলাদেশের (এবিবি) পক্ষ থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়।
এরপর মন্দা বাজারের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কাছ থেকে নিজেদের সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা চালানো হয়। এর বিপরীতে সংস্থা দুটির কাছে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বেশকিছু সুবিধা দাবি করা হয়।
শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক দরপতন আর বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ-প্রতিবাদে অনেকটা নিরুপায় হয়েই ব্যাংকগুলোকে বেশকিছু সুবিধা দেয়ার উদ্যোগ নেয় এসইসি। এরই অংশ হিসেবে এসইসির প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে শেয়ার ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির অনুকূলে ব্যাংক প্রদত্ত মূলধন ওই ব্যাংকের এক্সপোজার টু ক্যাপিটাল মার্কেট হিসেবে গণ্য হবে না বলে ঘোষণা করা হয়। কোনো কোম্পানির শেয়ারে ব্যাংকের দীর্ঘ মেয়াদী ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট ওই ব্যাংকের ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার হিসেবে গণ্য হবে না। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ উদ্ভুত কোনো ক্ষতির জন্য প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গেইন/লস নেট অফ করে প্রভিশন সংরক্ষণ করা যাবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, আগে প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নেট লসকে বিবেচনায় নেয়া হতো। শেয়ার ব্যবসায় নিয়োজিত কোনো ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির অনুকূলে প্রদত্ত ঋণ সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট অতিক্রম করে থাকলে সীমা অতিরিক্ত ঋণ সমন্বয়ের জন্য দুই বছর সময় বৃদ্ধির (২০১৩ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত) সুবিধা দেয়া হয়।
এছাড়া পুঁজিবাজারে মার্চেন্ট ব্যাংক ও সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানসমূহের তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও শীথিলতা আনা হয়। ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়, পুঁজিবাজারে মার্চেন্ট ব্যাংক ও সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ৯৯ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত মূলধন সরবরাহ করত প্যারেন্ট কোম্পানিসমূহ (ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি)। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সর্বনিন্ম ৫১ শতাংশ প্যারেন্ট কোম্পানি থেকে এবং অবশিষ্ট অংশ অন্য যে কোনো তহবিল থেকে নিয়ে মার্চেন্ট ব্যাংক ও সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন গঠন করতে পারবে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সুবিধা নেয়ার জন্য ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর কিছু দিন সংগঠনটির পক্ষ থেকে বেশ তোড়জোড় চালানো হয়। এক পর্যায়ে এ বিষয়ে এসইসির ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপণ জারি করে ছাড় দেয়া হয়। এরপরই ফান্ড গঠনের বিষয়ে ধীরে ধীরে দর্শকের ভূমিকায় উপনিত হয় সংগঠনটি।
যোগাযোগ করা হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা প্যাকেজে ব্যাংকগুলোকে বেশি সুবিধা দেয়া হয়েছে এ কথা স্বীকার করেন এসইসির এক সদস্য। তিনি বলেন, ওই সময় বাজার স্বাভাবিক করতে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প ছিল না। তাই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে সে কারণেই কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছিল। ওই সদস্য আরো জানান, ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর বিএবির পক্ষ থেকে বেশ কয়েক বার এসইসিতে ধরনা দেয়া হয়। তবে প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর সব কিছু থেমে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানান, বিএবির পক্ষ থেকে যে ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেয়া হয় এতে অধিকাংশ ব্যাংকেরই সম্মতি ছিল না। মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে কিছু সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার জন্য কয়েকটি ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম কয়েক দিন ফান্ডটির বিষয়ে বেশ আগ্রহ দেখানো হয়। পরিকল্পনা মাফিক বেশকিছু সুবিধা হাতিয়ে নিয়ে বিষয়টি নিয়ে আর মাথা ঘামানো হয়নি।
এ বিষয়ে বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিক দিন, একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সোমবার, ৯ এপ্রিল, ২০১২
বিএবি’র বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ
Posted by Ultra News Update on ৯:২১ AM